তিন নারী উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নারী উদ্যোক্তারা। প্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইনভিত্তিক ‘ই-কমার্স’ নারী উদ্যোক্তাদের এই ভূমিকাকে দিয়েছে গতি। সামাজিক যোগাযোগের প্লাটফর্ম ফেসবুকের কল্যাণে ‘এফ-কমার্স’-এ নিজেদের আরও পাকাপোক্ত জায়গায় নিয়ে গেছেন নারী উদ্যোক্তারা। এক হিসাব মতে, দেশের ‘এফ-কমার্স’র প্রায় ৮০ শতাংশের মালিক নারীরা। সফল এমন তিন উদ্যোক্তার গল্প তুলে এনেছে জাগো নিউজ।
সুইজারল্যান্ড, ইতালিসহ আট দেশে যায় মাকসুদার পণ্য
নিজের জমানো অর্থ ও গহনা বিক্রির টাকা দিয়ে ২০১৬ সালে ব্যবসা শুরু করেন ঢাকার মেয়ে মাকসুদা খাতুন। তার ‘শাবাব লেদার’ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথমে পাঁচজন শ্রমিক থাকলেও বর্তমানে কাজ করছেন অর্ধশতাধিক শ্রমিক। শুরুতে দুটি মডেলের চামড়ার লং জেন্টস ওয়ালেট বানালেও বর্তমানে তার ফ্যাক্টরিতে তৈরি হচ্ছে এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, এক্সিকিউটিভ ফাইল, লেডিস ব্যাগ, মেসেঞ্জার ব্যাগ, লেডিস পার্স, ব্যাকপ্যাক, বেল্ট, মাউস প্যাড, চাবির রিং, করপোরেট গিফট আইটেম, পেন হোল্ডার, পেন স্ট্যান্ড, ডায়েরি কভার, জ্যাকেটসহ যাবতীয় চামড়াজাত পণ্য।
জাগো নিউজকে মাকসুদা বলেন, বর্তমানে সুইজারল্যান্ড, ইতালি, গ্রিসসহ আট দেশে আমার পণ্য যায়। নিজেরা তৈরির পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট লাগেজ, কারুপণ্যসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। এছাড়া করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে সাপোর্ট দিচ্ছি। করোনা-পরবর্তী সময়ে আমরা অনলাইনে ব্যাপক রেসপন্স পেয়েছি। দারাজ, দেশিবেশিসহ বেশকিছু ই-কমার্স প্লাটফর্মে আমাদের পণ্য পাওয়া যায়। এছাড়া এফ-কমার্সেও আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি।
উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকতা পেশায় মনোনিবেশ করেছিলেন মাকসুদা। তবে সবসময়ই নিজে কিছু করার আগ্রহ ছিল তার। মাকসুদার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাশাপাশি পার্টনারশিপে চামড়াজাত পণ্য রফতানি করছিলেন। এক পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্বামীর ব্যবসার হাল ধরেন মাকসুদা। নানা জটিলতায় লোকসান হতে থাকায় বন্ধ হয়ে যায় স্বামীর ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেই সময় প্রায় ৭০ লাখ টাকা ঋণের বোঝা মাথায় আসে মাকসুদা দম্পতির। তাতেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন মাকসুদার স্বামী। নিজে শক্ত থেকে ব্যবসা দাঁড় করানোর উদ্যোগ নেন মাকসুদা। প্রথমে নিজেই বিভিন্ন দোকানে উৎপাদিত পণ্যের বিপণন শুরু করেন।
মাকসুদা খাতুন
মাকসুদা বলেন, ঋণের পরিমাণটা এতো ছিল যে; আমি বুঝতে পারি চাকরি করে এটা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তখন ব্যবসাটা মোটামুটি আয়ত্ত করে ফেলেছি। পুরোনো কিছু যন্ত্রপাতি কিনে শুরু করি। বুঝতে পারছিলাম নিজের পরিবারের জন্য কিছু করতে হবে। ঋণ শোধ করতে হবে। তা না হলে দুদিন পরে জেলে যেতে হবে। কেরানীগঞ্জে একটি ফ্ল্যাট, কিছু গহনা বিক্রি ও ডিপিএস ভেঙে কিছু ঋণ শোধ করলাম। প্রায় ১০ লাখ পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। এখন প্রায় ৩০টির মতো শোরুমে আমার পণ্য যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে একটি শোরুম নিয়েছি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফুটওয়্যার বিজনেস শুরু করেছি। এছাড়া বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘প্রেসিডেন্ট’-এ আমার পণ্য যাচ্ছে। ব্যাংক-বীমাসহ আটটা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে শাবাব লেদার সাপোর্ট দিয়ে থাকে। আরও কয়েকটিতে কথা বলছি।
তিনি বলেন, শুধু পুরুষরাই নারীদের জায়গা করে দেবে, তা নয়। নারীদের নিজের জন্য পরিচয় তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করতে হবে।
নিজে সৎ থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্যে সব বাধাই অতিক্রম করা যায় জানিয়ে তিনি বলেন, সব ধরনের লাইসেন্স, পেপার— সবকিছু আমি দ্রুত করতে পেরেছি। সেসব সমস্যা অন্য সব উদ্যোক্তা ফেইস করেন, আমিও সেসব ঘটনা ফেইস করেছি।
এই উদ্যোক্তা বর্তমানে ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ, ওমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর, নতুন প্রজন্ম, চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বেশকিছু সংস্থার সঙ্গেও কাজ করছেন।
চার হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু শামার
২০০৩ সালে মাত্র চার হাজার টাকা দিয়ে বুটিক ব্যবসা শুরু করেন শাফিয়া শামা। তখন রাজধানীর বেশকিছু ফ্যাশন হাউসে তৈরি পোশাক সরবরাহ করতেন তিনি। ২০০৮ সালের দিকে পাটপণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরির লক্ষ্যে ফ্যাক্টরি করেন হাজারীবাগে। করোনার কারণে সেই ফ্যাক্টরি বর্তমানে বন্ধ হলেও অন্য ফ্যাক্টরিতে চলছে তার পাটপণ্য তৈরির কাজ।
শাফিয়া শামার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘এমএস শামা’। নেদারল্যান্ডসসহ বেশকিছু দেশে রফতানি হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের পণ্য। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, ব্র্যাক ও এর বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, রবি, আইসিডিডিআরবিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে পাটপণ্য সরবরাহ করে ‘এমএস শামা’। সাফিয়া শামার পণ্যের ব্র্যান্ডের নাম ‘উড়ান’। অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে উড়ানের পণ্য।
পাটের প্রশিক্ষণ ব্যাগ, পাটের ফাইল, পর্দা, কুশন কভার, সোফা কভার, কম্বল, পর্দা, টেবিল রানার, টেবিল ম্যাট, কার্পেট, ডোরম্যাট, শতরঞ্জি, শোপিস নিয়ে কাজ করেন শামা। এমনকি পাট দিয়ে তৈরি শাড়ি, ব্লেজার, ফতুয়া, কটিও বিক্রি করেন এই উদ্যোক্তা।
শাফিয়া শামা
শাফিয়া শামা বলেন, ‘নিজের একটা পরিচয় গড়তে ব্যবসাটা শুরু করি। চাকরি করতে চাইলেও ফ্যামিলি রাজি ছিল না। আমি ছোটবেলা থেকে টিউশনি করতাম। নিজের খরচের টাকাটা নিজেই জোগাড় করতাম। বিয়ে হওয়ার পর যখন বাচ্চা হলো, তখন একটা বিষয় খুব ফিল করতাম। সেটা হলো ছোটখাটো বিষয়ের জন্য আরেকজনের কাছে টাকা চাইতে হয়। সেটা ভালো লাগতো না। তখন বাসায় থেকে ব্যবসাটা শুরু করি।’
তিনি বলেন, আমি রফতানি করি। ব্র্যাকসহ বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে আমার প্রোডাক্ট যাচ্ছে। প্যান্ডেমিকের মধ্যে আমার হাজারীবাগের ফ্যাক্টরিটা বন্ধ করে দিয়েছি। সেখানে প্রায় ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন। এখন কিছু অর্ডার আসছে। আশা করছি শিগগিরই ফ্যাক্টরিটা চালু করতে পারবো।
ব্যবসা করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, যখন শুরু করি তখন চারপাশের মানুষজন বলতে শুরু করে, মেয়েরা আবার ব্যবসা করে নাকি। বড় জোর টিচিং কিংবা ব্যাংকে চাকরি করবে। ফ্যামিলি থেকে বাধা তো ছিলই, পাশাপাশি পুঁজির একটা অভাব ছিল। তবে নিজে কিছু করার একটা জেদ ছিল, তাই হয়তো সব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে উড়ান নামে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি শুরু করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে পিছিয়ে গেছি। সেটাকে ফের চাঙ্গা করতে কাজ শুরু করেছি।
বাধা পেরিয়ে সফল উদ্যোক্তা হাসিনা মুক্তা
ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাক নিজে তৈরি করার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে মনোযোগী ছিলেন হাসিনা মুক্তা। ২০০৯ সালে ‘নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প’ নামে তৈরি পোশাক, ক্রাফটস উৎপাদন ও বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান করেন হাসিনা। একইসঙ্গে নিজ বাড়িতে হস্তশিল্প ট্রেনিং সেন্টার চালু করেন। সেখানে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন।
ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ১৯৯৮ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে পোশাক তৈরি ও ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৯ সালে বিয়ের পর বিভিন্ন সময় যুব উন্নয়ন অধিদফতরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেন। পরে স্বামীর সহযোগিতায় কয়েকটি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বুটিকসের কাজ শুরু করেন এই উদ্যোক্তা।
হাসিনা মুক্তা
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ব্যাগ, ম্যাট, কলমদানি, পাপোস ব্লক-বাটিকসহ নকশীকাঁথা, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কভার তৈরি হয় মুক্তার নতুনত্ব বুটিকস ও হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমি কিছু ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছি। একটা শোরুম আছে, পাশাপাশি আমার কারখানায় প্রায় ৬০ জন কর্মী কাজ করছেন। ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু হলেও বর্তমানে আমার মূলধন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকায়। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামীণ নারীদের দিয়ে নকশীকাঁথাসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের কাজ করছি আমরা।
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ হাসিনা মুক্তা ২০১৩ সালে পান নেলসন ম্যান্ডেলা অ্যাওয়ার্ড। সেই বছর নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পান কবি নজরুল সম্মাননা। নারীসেবা ও মানব উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মাননাও পান তিনি। ২০১৪ সালে মহিলা আত্মকর্মসংস্থানকর্মী হিসেবে পান জাতীয় যুব পুরস্কার।
এসএম/এইচএ/জিকেএস