করোনা আছে ভয় পালিয়েছে!
বাংলাদেশে করোনা আছে; ভয় পালিয়েছে। নমুনা পরীক্ষা কমলেও করোনা ভাইরাসে মৃত্যু ও আক্রান্তের প্রকৃত চিত্র এখনও ভয়াবহই বলতে হয়। শীত আসছে। ভয়াবহতা শীতে আরও বাড়বে। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এমনটা বলেছেন। এখন আমরা যেভাবে চলছি, এমন ভয়হীন চলাচল আমাদের যে মৃত্যুর মুখোমুখি করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
মহামারি হেলাফেলা সত্যিই আত্নঘাতী। মানুষের স্বাভাবিক চলা ফেরা,সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে মাস্ক বিহীন চলাফেরা ভাবনায় ফেলেছে দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। ঢিলেঢালা জীবনযাত্রায় করোনাভাইরাস দেশে যে কোন সময় আরও বেশি তাণ্ডব চালাতে পারে। বিষয়টি ভাবনার বটে!
ছয় মাসেও দেশে করোনা সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র আমাদের কাছে নেই। দেশে করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সঠিক চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে কম, মৃত্যুর হিসাবে উপসর্গ নিয়ে মৃতদের সংখ্যা নেই। সরকারি হিসেবে গত এক মাসে প্রায় সাড়ে ৯শ’ মানুষ করোনায় মারা গেছেন। আর এক মাসে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার। শনাক্তের হারে অন্য দেশের তুলনায় মৃত্যুর হার বাংলাদেশে বেশি। সেজন্য দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এটি বলতে নারাজ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষার অভাবে শনাক্ত ও মৃত্যুর হারের সঠিক সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যানে পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের সবচেয়ে পুরোনো পত্রিকা দৈনিক সংবাদ গত ১৮ সেপ্টেম্বর শীর্ষ সংবাদ হিসেবে ছেপেছে সংবাদটি। বলতে হয় বর্তমানে দেশে করোনার অবস্থা সমান্তরাল। প্রতিদিন মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন, প্রতিদিন বেশকিছু মানুষ মারা যাচ্ছেন। জনগণ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বেরিয়ে পড়েছেন, সতর্কতা নেই, ঢিলেঢালা ভাব সর্বত্র। সব মিলে বাংলাদেশে এখন আর করোনা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নেই। করোনাভাইরাস নিজের মতো চলছে যেকোন সময় সংক্রমণ বেড়েও যেতে পারে। এখন করোনা হালছাড়া নৌকার মতো ভেসে চলছে। যখন করোনা পরীক্ষা করার জন্য মানুষ আগ্রহ ছিল তখন নমুনা পরীক্ষা ফি আরোপ করে নিরুৎসাহী করা হয়েছে।
হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তিতে মানুষ আর করোনা নমুনা পরীক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। ভালো চিকিৎসা পায়নি বলে করোনা আক্রান্ত হয়ে এখন মানুষ আগের মতো হাসপাতালমুখেী হচ্ছে না। দেশে করোনার অবস্থা সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সারোয়ার আলীর একটি বক্তব্য পত্রিকায় দেখলাম। তিনি বলেন, সরকারি হিসেবে দেশে করোনা সংক্রমণ কমেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের তুলনায় মৃত্যুর হার কম বাংলাদেশে। কিন্তু করোনা উপসর্গ নিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের সংখ্যা সরকারের তালিকার মধ্যে নেই। সুতরাং করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা একটু বেশি হবে বলে আমার ধারণা।
এছাড়া দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এই কথা বলার সময় এখনও আসেনি। বিশ্বের কোন দেশই এ মুহূর্তে বলতে পারবে না, যে তাদের দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই। আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ এখন নতুন করে লকডাউনে যাচ্ছে। আমাদের সরকারকেও এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। দেশে করোনা সংক্রমণের ছয় মাসের বেশি সময় পেরোলেও এখনও সব জেলায় নমুনা পরীক্ষাকেন্দ্র (ল্যাব) চালু করতে পারেনি সরকার। বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৬টি জেলায় পরীক্ষাকেন্দ্র চালু আছে। পরীক্ষাকেন্দ্র না থাকা ৩৮ জেলায় রোগী শনাক্তের পরিমাণ কম। নমুনা পরীক্ষা এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট নয়। ফলে জনসংখ্যা অনুপাতে পরীক্ষার দিক থেকে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। সরকারের করোনাবিষয়ক পুরো কার্যক্রমেই একটা গাছাড়া, ঢিলেঢালাভাব দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার পরও জেলা পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু করেনি। পরীক্ষা কম হওয়ায় সন্দেহভাজন অনেক রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি যে ভালো নয় এখানে এক দিনের একাটি চিত্র তুলে ধরলে নিশ্চয় বিষয়টিতে পরিষ্কার ধারণা পাবেন পাঠক।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর বুধবার দেশে দেড় মাসে সর্বনিম্ন একদিনে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে আর ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার চব্বিশ ঘণ্টায় ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবারের তুলনায় বৃহস্পতিবার ১৫ জন মানুষের মৃত্যু বেশি হয়েছে। এ দিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরও এক হাজার ৫৯৩ জন। সব মিলে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ৮৫৯ জনের। আর মোট করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৬৪ জন। আগের তুলনায় করোনার নমুনা পরীক্ষা কমানোর ফলে শনাক্তের হার কমছে কিন্তু মৃত্যুর হার বাড়ছে। এ থেকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, করোনা নমুনা পরীক্ষা বাড়লে শনাক্ত বেশি হবে। সেই ক্ষেত্রে মৃতের সংখ্যাও বাড়তে পারে। সেখানে কোনভাবেই বলা যাবে না যে দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন শীতকালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে উল্লেখ করে এই মুহূর্ত থেকেই তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শীতকাল আসন্ন। কোন কোন ক্ষেত্রে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। আমাদের এই মুহূর্ত থেকেই তা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।’ আসলে আমারা সতর্ক নই বললেই চলে। জনসমাগম সবখানেই হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ভাবে। হাটবাজার পুরদমে জমছে। কখনো কখনো মনে হয় আগের চেয়ে বাজারে এখন যেন বেশি মানুষ। মানুষের হুঁশ নেই।
মজুতদাররা এই সুযোগে পিঁয়াজ, চাল, ডাল, তেল, ঝাল, মরিচের দাম বেড়েই চলেছে। অহেতুক ঘুরতে না যাওয়ার, বেশি মানুষ এক জায়গায় না হওয়ার, আড্ডাবাজি বন্ধ করতে হবে। সবাই সতর্কতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে না পড়লে আমরা হয়তো এ যুদ্ধে হেরে যাব। আসুন সবাই সতর্কতার যুদ্ধে নামি। যেহেতু করোনার ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি সেজন্য সতর্কতার বিকল্প নাই। এ যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে।
যুদ্ধ জয়ের জন্য আতঙ্কগ্রস্ত হলে চলবে না। সরকারের গৃহীত ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিকভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সর্বদা বজায় রাখতে হবে। নিজে সতর্ক থাকতে হবে অপরকে সতর্ক করতে হবে। ভাইরাস থেকে রক্ষার একটাই পথ সতর্কতা। প্রশাসন ছাড়াও সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে।
লেখক : সাংবাদিক।
এইচআর/এমএস