ভিডিও EN
  1. Home/
  2. সাহিত্য

‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটির উৎস কোথায়?

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান | প্রকাশিত: ০৫:০৭ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২০

সম্প্রতি ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’/‘যুবতী রাধে’ গানটি গেয়েছেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ও শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন। সংগীতায়োজন করেছেন পার্থ বড়ুয়া। গানটি ‘আইপিডিসি আমাদের গান’ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই প্রশ্ন ওঠে গানের কথা ও সুর নিয়ে। ইউটিউবে দেয়া ক্রেডিট লাইনে গানটির কথা ও সুর ‘সংগৃহীত’ উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু সরলপুর ব্যান্ড থেকে দাবি করা হয়: গানটি তাদের। তাদের কাছে কপিরাইট সনদও রয়েছে। এমন দাবির মুখে ফেসবুক থেকে পরিবেশক প্রতিষ্ঠান গানটি সরিয়ে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, নিন্দা, বাক্যবাণ পক্ষে-বিপক্ষে কম হয়নি।

আমাদের এ লেখার উদ্দেশ্য ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ বা ‘যুবতী রাধে’ গানটির উৎস সন্ধান করা। তথ্য-উপাত্ত, গ্রন্থের আলোকে জানা গানটি প্রকৃত অর্থে কার লেখা, এটি সত্যিই কি লোকসংগীত, না কি সরল ব্যান্ডের সৃষ্টি? এ আলোচনা শুরুর পূর্বে এ বিষয়ে দুটি পক্ষেরই মন্তব্য জেনে নেয়া যাক। চঞ্চল-শাওনের গাওয়া গানটি প্রকাশের পর ফেসবুক লাইভে এসে সরলপুর ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট মারজিয়া আমিন তুরিন বলেছেন, ‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি তাদের। তাদের কাছে কপিরাইট সনদও আছে। ২৪ অক্টোবর একাত্তর টিভির অনুষ্ঠানে সরলপুর ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা, ভোকালিস্ট তরিকুল ইসলাম তপন বলেন, ‘এ গানটি আমাদের। আমরা এ গানটি লেখা শুরু করি ২০০৬-২০০৭ সাল থেকে। সর্বপ্রথম গানটি প্রকাশ করি ২০১০-এর দিকে।’ গানটি তাদের ‘মৌলিক গান’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‌‌আমরা রাধা-কৃষ্ণের যে গান, গল্পগুলো শুনেছি, সেখান থেকে তথ্য, শব্দচয়ন, ভাবধারা সংগ্রহ করেছি ৩০ ভাগ। আমরা সেখান থেকে হুবহু কোনো লাইন সংগ্রহ করিনি। আমরা রাধা-কৃষ্ণের গান শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। পুরো গানটি আমরা আমাদের মতো করে লিখেছি। আমরা কোথাও থেকে হুবহু নিইনি।

অন্যদিকে পার্থ বড়ুয়া, চঞ্চল চৌধুরী, মেহের আফরোজ শাওন বলেছেন, গানটিকে তারা লোকসংগীত হিসেবে জানতেন। ফলে ক্রেডিট লাইনে কথা ও সুর ‘সংগৃহীত’ বলা হয়েছে। সরলপুর ব্যান্ডের কপিরাইট বিষয়ে তারা অবহিত ছিলেন না। তারা বিষয়টি নিয়ে ‘বিস্মিত’, ‘বিব্রত’, ‘বিভ্রান্ত’।

আলোচনার সুবিধার্থে সরল ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটিও এখানে উপস্থাপিত হলো:

‘সর্বত মঙ্গল রাধে বিনোদিনী রাই

বৃন্দাবনের বংশীধারী ঠাকুর কানাই।

একলা রাধে জল ভরিতে যমুনাতে যায়

পেছন থেকে কৃষ্ণ তখন আড়ে আড়ে চায়।

জল ভর জল ভর রাধে ও গোয়ালের ঝি

কলস আমার পূর্ণ কর রাধে বিনোদী।

 

কালো মানিক হাত পেতেছে চাঁদ ধরিতে চায়

বামন কি আর হাত বাড়ালে চাঁদের দেখা পায়।

কালো কালো করিস্ না লো ও গোয়ালের ঝি

আমায় বিধাতা করেছে কালো আমি করব কি।

 

এক কালো যমুনার জল সব লোকই খায়

আগে কালো আমি কৃষ্ণ সকল রাধে চায়।

এই কথা শুনিয়া কানাই বাঁশি হাতে নিল

সর্প হয়ে কালো বাঁশি রাধেকে ধংশিল ।

বামপায়ে ধংশিল রাধের বামপায়ে ধরিল

মরলাম মরলাম বলে রাধে জমিনে পরিল।

 

মরবে না মরবে না রাধে মন্ত্র ভাল জানি

দু-একখানা ঝাড়া দিয়ে বিষ করিব পানি।

এমন অঙ্গের বিষ যে ঝাড়িতে পারে

সোনার এই যৌবনখানি দান করিব তারে।

 

এই কথা শুনিয়া কানাই বিষ ঝাড়িয়া দিল

ঝেড়ে-ঝুড়ে রাধে তখন গৃহবাসে গেল।

গৃহবাসে গিয়ে রাধে আড়ে পেঁচায় চুল

কদম ডালে থাইক্কা কানাই ফিক্কা মারে ফুল।

 

বিয়া নাকি কর কানাই বিয়া নাকি কর

পরের রমনি দেখে জ্বালায় জ্বলে মর।

বিয়াতো করিব রাধে বিয়াতো করিব

তোমার মত সুন্দর রাধে কোথায় গেলে পাব।

আমার মত সুন্দর রাধে যদি পেতে চাও

গলায় কলস বেঁধে যমুনাতে যাও।

কোথায় পাব হার কলসি কোথায় পাব দড়ি

তুমি হও যমুনা রাধে আমি ডুবে মরি।

 

দুই.

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য কবি দ্বিজ কানাই। তাঁর রচনা ‘মহুয়া’ পালা। এটি ১৬৫০ সালে রচিত। ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘মহুয়া’ পালাটি ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’য় গ্রন্থভুক্ত করেছেন। বইটির ভূমিকায় ড. সেন লিখেছেন, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আনুকূল্যে চন্দ্রকুমার দে মৈমনসিংহের গাথা সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিযুক্ত হন। তিনি তাঁকে ‘মহুয়া’সহ মোট ২১টি পালা সংগ্রহ করে দিয়েছেন। সুতরাং ‘মহুয়া’ পালার প্রাচীনত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই। মৈমনসিংহ-গীতিকার তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। বইটি থেকে ‘মহুয়া’ পালার ৫ নং পর্বটির চার লাইন হুবহু তুলে ধরছি। দ্বিজ কানাই লিখেছেন:

                                                ‘লজ্জা নাই নির্লজ্জ ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর।

                                                গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর \’

                                                ‘কোথায় পাব কলসী কইন্যা, কোথায় পাব দড়ী।

                                                তুমি হও গহীন গাঙ্ আমি ডুব্যা মরি \’

 

অন্যদিকে সরল ব্যান্ড তাদের ‘যুবতী রাধে’ গানটিতে লিখেছে:

                                                ‘আমার মত সুন্দর রাধে যদি পেতে চাও

                                                গলায় কলস বেঁধে যমুনাতে যাও।

                                                কোথায় পাব হার কলসি কোথায় পাব দড়ি

                                                তুমি হও যমুনা রাধে আমি ডুবে মরি।’

দ্বিজ কানাইয়ের সঙ্গে সরল ব্যান্ডের ভাব, বাক্য ও শব্দের কী ঘনিষ্ট মিল! এ থেকে কি মনে হয় গানটির কথা মৌলিক?

তিন. 

শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য্যের লেখা ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’ (২য় খণ্ড) গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬২ সালে। প্রকাশক ক্যালকাটা বুক হাউজ। বইটির ২১২ ও ২১৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে:

‘নিম্নোদ্ধৃত ছড়াটিতে সুপরিচিত পল্লী গীতিকার সুর শোনা যায়-

                                                ...

                                                ছান করিয়া আইস্যা রাধে মেইলা দিলেন চুল,

                                                পিছন হইতে কিষ্টঠাকুর মেইলা মারলেন ফুল।

                                                “অমন ক্যানে কর কিষ্ট, অমন ক্যানে কর?

                                                যমুনার জলে গিয়া তুমি ডুইব্যা মর।”

                                                “কোথায় পাইমু হাড়ি কলসী, কোথায় পাইমু দড়ি?

                                                রাধে, তুমি হও যমুনার জল, আমি ডুইব্যা মরি।”

                                                                                                        -ঢাকা”

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি দেয়ার পরপরই আশুতোষ ভট্টাচার্য্য মন্তব্য করেছেন, এই পদগুলোর মধ্যে ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’র মহুয়া পালার সুপরিচিত কয়েকটি পদের প্রভাব রয়েছে।

আশুতোষ ভট্টাচার্য্যের সংগ্রহ করা পঙক্তিগুলো পাঠের পর এবার সরলপুর ব্যান্ডের গানটির আরও কয়েক লাইন উদ্ধৃতি করছি। দেখুন মিল পাওয়া যায় কি না:

                                                “গৃহবাসে গিয়ে রাধে আড়ে পেঁচায় চুল

                                                কদম ডালে থাইক্কা কানাই ফিক্কা মারে ফুল।

                                                বিয়া নাকি কর কানাই বিয়া নাকি কর

                                                পরের রমনি দেখে জ্বালায় জলে মর।

                                                বিয়াতো করিব রাধে বিয়াতো করিব

                                                তোমার মত সুন্দর রাধে কোথায় গেলে পাব।

                                                আমার মত সুন্দর রাধে যদি পেতে চাও

                                                গলায় কলস বেঁধে যমুনাতে যাও।

                                                কোথায় পাব হার কলসি কোথায় পাব দড়ি

                                                তুমি হও যমুনা রাধে আমি ডুবে মরি।”

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি দুটি পাঠের পর সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারবেন আশুতোষ ভট্টাচার্য্যের সংগ্রহের সঙ্গে সরল ব্যান্ডের গানটি কতটা সাযুজ্যপূর্ণ। পাশাপাশি একটু সচেতন দৃষ্টি দিলেই চোখে পড়বে সরল ব্যান্ড গানটিতে নতুন কিছু বাক্য যোগ করেছে এবং দু-এক জায়গায় ভাব ও বিষয়কে ভিন্নরূপ দিয়েছে। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ বাক্যের মধ্যে মিল লক্ষ্যণীয়।

চার.

বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘বাঙলার গ্রাম্যছড়া’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। প্রকাশক স্বারস্বত লাইব্রেরি। এ গ্রন্থের ১৬-১৭ পৃষ্ঠায় রাধা-কৃষ্ণের আলোচ্য পর্বটি সঙ্কলিত হয়েছে। সেই পর্বটির প্রায় সবটুকুই পত্রস্থ করা হলো:

“সর্বমঙ্গলে রাধে বিনোদিনী রাই।

বৃন্দাবনে বন্দী পীর ঠাকুর কানাই \

....

তুমি তো কালুয়া কানাই তাইতে তোমার এত।

সুন্দর হইলে পদ ভূমে না পড়িত \

কালো কালো করিস না লো ও গোয়ালের ঝি

বিধাতা করেছে কালো আমি করব কী?

এক কালো যমুনার জল সর্বলোকে খায়।

কালো মেঘের ছায়ায় বসে শরীর জুড়োয় \

....

পরের রমণী দেখে অমন কেন কর।

পালের গাভী বেচে বিয়ে না কেন কর \

বিয়ে করিব রাধে বিয়েতো করিব।

তোমার মত সুন্দর রাধে কোথায় গিয়ে পাব?

আমার মতো সুন্দর রাধে কানাই যদি চাও।

গলায় কলসী বেঁধে যমুনাতে যাও \

কে বা দেবে কলসী রাধে কে বা দেবে দড়ি।

তুমি রাধে হও যমুনা আমি ডুবে মরি \

 

এই কথা বলিয়ে রাধে সোজা চলে যায়।

কানুর হাতের বাঁশি তখন সর্প হয়ে ধায় \

ডান পায়ে জড়ায়ে সর্প দংশিল বাম পায়।

মলাম মলাম রব করিয়ে ঢলে পড়ল রাই \

এই সর্পের বিষ যে জন ভালো করিতে পারে।

এই রূপ যৌবন আমি দান করিব তারে \

কানাই উঠিয়া বলে মহামন্ত্র জানি।

বার চার পাঁচ ঝাড়লে পরে বিষ হইবে পানি \

একবার ঝাড়িতে বিষ রাধা কইল কথা।

কী না সাপের বিষ রে বাবা ধরল বুকের ছাতা \

আর একবার ঝাড়িতে বিষ হয়ে গেল পানি।

রাধাকৃষ্ণের যুগলমিলন বল শিবের ধ্বনি \”

এই অংশটুকু সম্পূর্ণ দেয়ার চেষ্টা আমার ছিল। কিন্তু বইটির হার্ড কপি এত দ্রুত জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। উপরোক্ত উদ্ধৃতি গুগুল বুকস্-এর প্রদর্শনী থেকে নেয়া হয়েছে।

পাঁচ.

১৯৬৬ সালে আশুতোষ ভট্টাচার্যের ‘বঙ্গীয় লোক-সঙ্গীত রত্নাকর’ বইটির তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের ৫৭৫-৭৬ পৃষ্ঠায় সংকলিত হয়েছে ২২ লাইনের একটি ঝাপান গান। এ গানটির সঙ্গেও সরল ব্যান্ডের গানটির বেশ মিল রয়েছে। চাইলে পুরোটাই উদ্ধৃতি দেয়া যেত, স্থান সীমাবদ্ধতায় কেবল প্রথম চার লাইন উদ্ধৃতি করা হলো:

                “সর্ব জয় মঙ্গলা রাধে বিনোদিনী রায়।

                বৃন্দাবন মন্দিরে গাইব ঠাকুর কানাই \

                আজকে রাধে কুম্ভ কক্ষে জল ভরিতে যায়।

                ধীরে ধীরে চিকন কালা পিছে পিছে যায় \”

উল্লিখিত তথ্য-উপাত্তের বাইরেও দে’জ পাবলিকেশন্স থেকে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১০৯ নম্বর পৃষ্ঠায়; বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘লোকসাহিত্য সঙ্কলন’ ২৫তম খণ্ডের ১৮ পৃষ্ঠায়সহ বিভিন্ন গ্রন্থে রাধা-কৃষ্ণের উল্লেখিত চরণসমূহ স্বল্প পরিসরে রয়েছে।

ছয়.

সরলপুর ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা তরিকুল ইসলাম তপন যে বলেছিলেন, গানটি ২০০৬-০৭ সালে লেখা, তাদের মৌলিক গান এবং তারা সেখান থেকে হুবহু কোনো লাইন সংগ্রহ করেননি-উপর্যুক্ত তথ্য-উপাত্তের আলোকে বলা যায়, তার দাবিটি যথাযথ নয়। বরং প্রতীয়মান হয়, গানটি লোকসাহিত্য, লোকসংগীতের অংশ। সরলব্যান্ড গানটিকে সংযোজন, পরিমার্জন করেছে, ভাষাকে সমকালীন রূপ দিয়েছে। কিন্তু গানটি নিঃসন্দেহে তাদের মৌলিক সৃষ্টি নয়। এক্ষেত্রে গানটির কপিরাইট পুনঃবিবেচনা করা জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।

শিল্প-সংস্কৃতির স্বার্থেই তর্ক-বিতর্ক হবে, তবে সেটি হোক প্রমিত। আমাদের আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের লক্ষ্য হোক যথাসম্ভব সত্যে পৌঁছানো। সবার কল্যাণ হোক।

লেখক: কবি ও গল্পকার।

এসইউ/এএ/জেআইএম

আরও পড়ুন