দেশজুড়ে

সরকারি ঘর পেয়েও থাকেন না মুন্নি ও চায়না

মাদারীপুরে সরকারি ঘর পেয়েও থাকেন না মুন্নি ও চায়নাসহ বেশ কয়েকজন। তারা ঘর পাওয়ার পর কিছুদিন থাকলেও প্রায় এক বছর ধরে থাকেন না। ঘরের মধ্যে মালপত্র রেখে তালা দিয়ে ঘরটি দখল করে রেখেছেন।

Advertisement

মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুরের খৈয়রভাঙ্গা এলাকায় মুজিব শতবর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসনের ঘরগুলোতে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ঘরে কেউ থাকে না।

এ নিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাইনউদ্দিনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, দ্রুত তদন্ত করে যারা ঘরে থাকেন না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সরেজমিন ঘুরে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুজিব শতবর্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসনের জন্য মাদারীপুর সদর উপজেলার প্রথম পর্যায়ে পেয়ারপুরে ৬০টি, মস্তফাপুরে ৪০টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে কুনিয়ায় ২৮টি পেয়ারপুরে ৯টি, কালিকাপুরে ১৩টি, মস্তফাপুরে ২৫টি এবং তৃতীয় পর্যায়ে পেয়ারপুরে ৩৮টিসহ মোট ২১৩টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

Advertisement

এসব ঘরে এখনও অনেক পরিবার ওঠেনি। ঘর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার মস্তফাপুরের খৈয়রভাঙ্গা এলাকায় গেলে দেখা যায়, এখানে প্রথম পর্যায় প্রায় এক বছর তিন মাস আগে ৪০টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৫টি ঘর নির্মাণকাজ কয়েকদিন আগে শেষ হয়েছে। তবে এই ঘরগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘরের দরজা-জানালার কাজ নিম্নমানের দেখা গেছে। কোনো কোনো দরজার লক সমস্যা আবার কোনো জানালার গ্রিল ও কপাটে সমস্যা। এই ২৫টি ঘর যাচাই-বাছাই করে ভূমিহীনদের মধ্যে বরাদ্দ চলমান।

দ্বিতীয় পর্যায়ের ঘরে নতুন উঠেছেন লাবণী। তিনি ১১ নভেম্বর সরকারি ঘরে উঠেছেন। লাবণী বলেন, আমার ঘরের দরজা ও বাথরুমের দরজা লাগানো যায় না, জানালা ভাঙা।

Advertisement

আরও একজন নতুন উঠেছেন। নাম মো. কাশেম। তিনি বলেন, আমার ঘরের পেছনের দরজার লকে সমস্যা। জানালায় সমস্যা। বাথরুমের দরজার পেছনে ফাটা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথম পর্যায়ের বরাদ্দে ৪০টি ঘরের মধ্যে ১০ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ দেওয়া আছে মুন্নি নামের একজনকে। তিনি এক বছর আগে ঘর পাওয়ার পর এক মাসের মতো থেকেছেন। এরপর তার বাবা মো. দুলাল মাঝে মধ্যে এসে থাকলেও এখন তাও থাকেন না। ঘরের মধ্যে মালামাল রেখে তালা দেওয়া।

স্থানীয় কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুনেছি মুন্নির বাচ্চা হয়েছে। তাই সে শহরে থাকে। মুন্নির বাবা মাঝে মধ্যে এসে রাতে থাকতেন। এখন তাও থাকেন না। তার ঘরের মধ্যে মালপত্র রাখা আছে।

৩৪ নম্বর ঘরটি চায়না নামের একজনকে দেওয়া হয়েছে। তিনিও এক বছর আগে এক সপ্তাহের মতো থেকে আর থাকেন না। ঘরে তালা দিয়ে রেখে গেছেন।

চায়নার ব্যাপারেও স্থানীয়রা বলছেন, যেদিন ঘর দিয়েছে, সেদিন ঘর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেছেন। এরপর ঘরের জন্য কিছু মালামাল এনে সপ্তাহখানেক থেকে আর থাকেননি। তিনি কোথায় যেন হোটেলে কাজ করেন। সেখান থেকে যাতায়াত করতে অসুবিধা হয়, তাই থাকেন না।

স্থানীয় সিমা বেগম বলেন, চায়না এখানে থাকবেন না। অনেক আগেই মালপত্র নিয়ে চলে গেছেন। মস্তফাপুরে একটি হোটেলে কাজ করেন। হোটেলের কাছে চৌকদার ব্রিজ এলাকায় একটি বাসাভাড়া নিয়ে থাকেন।

আরেক নারী জানান, চায়না এখানে এক বছর আগে সপ্তাহখানেক ছিলেন। তারপর আর থাকেন না। সপ্তাহখানেক থেকে বলেন, আমি এখানে থাকবো না। আমার এখানে ভালো লাগে না। অফিসার আসলে আপনারা আমার ব্যাপারে না বলে দিয়েন।

মোহাম্মদ নামের একজন এখানে প্রায় এক বছর থাকলেও বর্তমানে দুই মাস ধরে থাকেন না। ২৯ নম্বর ঘরে থাকেন বাহাদুর নামের একজন। তিনিও মাঝে মধ্যে এসে থাকেন। নিয়মিতভাবে থাকেন না। এছাড়াও ৩৫, ৩৮ ও ৩৯ নম্বর ঘরটি প্রথম পর্যায়ে নির্মাণ হলেও এখনও তালাবদ্ধ দেখা যায়। শুরু থেকেই এই ঘরে কেউ থাকে না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।

এ ব্যাপারে মাদারীপুর সদর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, প্রথম পর্যায়ে ১ কোটি ৭১ লাখ, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ও তৃতীয় পর্যায়ে ৯১ লাখ ২০ হাজার টাকার ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এই ঘরগুলো বরাদ্দ পাওয়ার পর যারা থাকেন না তাদের ব্যাপারে তদন্ত করে সত্যতা পেলে বরাদ্দ বাতিল করা হবে। বাতিলের পর নতুন করে যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের দেওয়া হবে। তাছাড়া আমরাও মাঝে মধ্যে খোঁজখবর নেই। অনেক সময় সঠিকভাবে জানা যায় না, কারণ অনেকেই ঘরে তালা দিয়ে কাজে যান, ফেরেন অনেক রাতে। আবার অনেকেই খুব ভোরে কাজে যান। তাই সব মিলিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ের মস্তফাপুরের খৈয়রভাঙ্গায় যে ২৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে সেই ঘরগুলোর যে সমস্যার কথা বললেন, তা পরিদর্শন করে ঠিক করা হবে। এটা বড় ধরনের কোনো সমস্যা নয়। আসলে ঘরগুলো নির্মাণের সময় ও পরে স্থানীয় কিছু বখাটে হিংসা করে দরজা-জানালায় ইট দিয়ে জোরে ধাক্কা দিয়ে এমন অবস্থা করতে পারে। সেগুলো পরিদর্শন করে সব ঠিক করে দেওয়া হবে।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাইনউদ্দিন বলেন, চায়না ও মুন্নিসহ যারা ঘরে থাকেন না, তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে বরাদ্দ বাতিল করা হবে। এ ব্যাপারে অলরেডি কাজ শুরু হয়েছে। যারা থাকেন না তাদের বাদ দিয়ে, যারা পাওয়ার যোগ্য তাদের নতুনভাবে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে আগামীতে আমাদের মিটিং আছে। সেখানে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মিত নতুন ঘরের দরজা-জানালার ত্রুটির ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, আসলে এগুলো বড় ধরনের সমস্যা নয়, পরিদর্শন করে সবগুলো ঠিক করা হবে।

এসএইচএস/এসআর/জেআইএম