অর্থনীতি

কারখানা চালু রাখার পক্ষে উদ্যোক্তারা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের না

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এবার কঠোর লকডাউনে যাচ্ছে সরকার। প্রথম দফায় ১৪ এপ্রিল থেকে সাতদিনের জন্য এই লকডাউন দেয়া হবে। এ সময়ে জরুরি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস বন্ধ থাকবে। বন্ধ থাকবে গণপরিবহনসহ শিল্পকারখানাও।

Advertisement

শুক্রবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জাগো নিউজকে এসব তথ্য জানান। এ ব্যাপারে রোববারের (১১ এপ্রিল) মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে শিল্প-কলকারখানাগুলোকে লকডাউনের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, শ্রমিকরা কারখানার মধ্যে থাকলে সংক্রমণ হার কমবে। উদ্যোক্তাদের মতে, ইউরোপ, আমেরিকা, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতসহ বিশ্বে অনেক উন্নত রাষ্ট্রে লকডাউন ঘোষণা করা হলেও সেখানে শিল্প-কলকারখানা চালু রয়েছে, তাই এ দেশেও চালু রাখতে হবে।

মালিকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে শ্রমিক নেতারা বলছেন, মুনাফার জন্য শ্রমিকের জীবন বিপদের মধ্যে ঠেলে দেয়া ঠিক হবে না।

Advertisement

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবার আগে জীবন। লকডাউন মানে কিছু খোলা-কিছু চলবে এটা হতে পারে না। এতে জনজীবন আরও বিপর্যয়ে পড়বে।

এর আগে গত ৯ এপ্রিল সকালে সরকারি বাসভবনে ব্রিফিংয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দেশে করোনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। কিন্তু এতেও জনগণের উদাসীনতা কমেনি। এ অবস্থায় জনস্বার্থে সরকার আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তা-ভাবনা করছে।’

লকডাউনের আওতায় সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রফতানি আয়ের ৮৪ শতাংশ আসা তৈরি পোশাকখাত। একই সঙ্গে বিপদের মুখে পড়তে পারেন এ খাতে কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। অতীতে দেখা গেছে, লকডাউন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকরা বাড়িমুখী হন। এতে রাজধানী থেকে সারাদেশে ব্যাপকহারে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

কারখানা মালিকরা বলছেন, শ্রমিকরা কারখানায় কাজ করলে এর বাইরে তাদের যাওয়ার সম্ভাবনা কম। ছুটি পেলেই তাদের বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।

Advertisement

এ বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা এবং বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে শামীম এহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক উন্নত-উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে লকডাউন চলছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অনেক প্রদেশও লকডাউনের আওতায় এসেছে। কিন্তু সেখানে উৎপাদনমুখী শিল্প চলছে, উৎপাদন অব্যাহত আছে এবং সঙ্কটকালে স্ব স্ব দেশের অর্থনীতিতে তারা ভূমিকা রাখছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের দাবি থাকবে, যারা কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারবেন তাদের কারখানা চালু রাখতে দিন; যাতে তারা সময় মতো পণ্য রফতানি করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হতে পারেন।’

ফজলে শামীম এহসান আরও বলেন, ‘আমরা কঠোরভাবে কারখানা চালু রাখার কথা বলছি। কেউ কঠোর স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কারখানা চালাতে পারবেন না।’

মালিকদের দাবির সঙ্গে একমত নন শ্রমিক নেতারা। তারা বলছেন, মালিকপক্ষ সবসময় মুনাফাকে গুরুত্ব দেয়। তারা জীবনের চেয়ে অর্থটাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়ায় পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ বিষয়ে শ্রমিক নেতা মোশরেফা মিশু জাগো নিউজকে বলেন, ‘লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকবে। জীবনের চেয়ে তো আর বড় কিছু নেই। শ্রমিকের জীবন রক্ষা হলে পরে আবারও তারা উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মালিকরা শ্রমিকের জীবনের চেয়ে মুনাফাকেই বেশি প্রাধান্য দেন। আমাদের চাওয়া থাকবে শ্রমিকরা বেতন-বোনাস সঠিক সময়ে পাবেন। পাশাপাশি সরকারি সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ মেনে নেবেন।’

এদিকে, লকডাউনের সময় কিছু প্রতিষ্ঠান চালু থাকবে আর কিছু বন্ধ থাকবে এমনটা মানতে নারাজ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এতে কোভিড-১৯ আরও মানুষের মাঝে বিস্তার লাভ করবে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘লকডাউন কোমল বা কঠোর হয় না। লকডাউন হলো- সবকিছু বন্ধ থাকবে; সেটা কারখানা-সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে পারে। কিছু বন্ধ, কিছু খোলা রেখে লকডাউন হলে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন যেন মুনাফার কাছে মলিন না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘তবে হাসপাতাল, ফার্মেসি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান খোলা থাকতে হবে।’

ইএআর/এমআরআর/এসএইচএস/এমকেএইচ