মতামত

পূর্ণিমা নয়, মোশাররফ করিমের পাশে আছি

একজন শিল্পীর দায়িত্ব শুধু গান গাওয়া বা অভিনয় করা নয়। সমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেয়া, সংস্কারও তার সামাজিক দায়িত্ব। খেলোয়াড়, শিল্পী, অভিনেতা, গায়ক, লেখকরা যেহেতু জনপ্রিয়; তা তাদের পক্ষেই সম্ভব এই সংস্কারে নেতৃত্ব দেয়া।

Advertisement

লাখো মানুষ তাদের অনুসরণ করে। তাদের সামনে সত্য মূল্যবোধ তুলে ধরাটাও তাদের দায়িত্বেরই অংশ। তবে শিল্পীদের অনেকে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করতে চান। তাই দায়িত্বের এই অংশটা ভুলে যান অনেকেই। কোনো বিতর্কে নিজেকে জড়াতে চান না। তবে কম হলেও এমন শিল্পী আছেন। উদাহরণের জন্য খুব বেশি দূর যেতে হবে না।

পাশের দেশ ভারতের আমির খান সুপারস্টার। তার উপস্থাপিত ‘সত্যমেব জয়তে’ রীতিমত তোলপাড় তুলেছে ভারতজুড়ে। এমন অনেক সত্য তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, যা এতদিন সবার চোখের সামনে থাকলেও কেউ দেখছিল না। আমির খান দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ইচ্ছা থাকলে সামাজিক দায় মেটানো সম্ভব। আর শেষ পর্যন্ত জয় হয় সত্যেরই।

‘সত্যমেব জয়তে’র আদলে বাংলাদেশে চ্যানেল২৪ ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামে একটি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করে। বাল্যবিবাহ, সড়ক দুর্ঘটনা, অটিজম, যানজট, মেয়েদের ঋতুকালীন সমস্যা, শিশু ধর্ষণ, বৃহন্নলা, পরিবেশদূষণের মত বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠানটির ১৩ পর্ব ধারণ করা হয়েছে। ১১ মার্চ থেকে সপ্তাহের প্রতি রোববার রাতে অনুষ্ঠানটি প্রচার শুরু হয়।

Advertisement

১৮ মার্চ অনুষ্ঠানটির দ্বিতীয় পর্ব প্রচারের পরই গোল বাঁধে। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনা করছেন মোশাররফ করিম। ইদানিং টিভি বা সিনেমা খুব একটা দেখা হয় না বলে মোশাররফ করিম কেমন অভিনয় করেন জানি না। তবে তিনি যে তুমুল জনপ্রিয় তা বুঝতে পারি। পত্রিকা পড়ে, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আলোচনায় টের পাই মোশাররফ করিম রীতিমত ক্রেজ। তাই চ্যানেল২৪ ‘জাগো বাংলাদেশ’এর মত একটি সমাজ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের জন্য সঠিক উপস্থাপককেই বেছে নিয়েছে।

১৮ মার্চ প্রচারিত অনুষ্ঠানে মোশাররফ করিম কথা বলেন ধর্ষণ নিয়ে। অনুষ্ঠানটি আমি দেখিনি। পরে ইউটিউবে নির্বাচিত অংশ দেখেছি। প্রায়ই ধর্ষণের যুক্তি হিসেবে ধর্ষিতার পোশাককে দায়ী করা হয়। এই কুযুক্তির প্রতিবাদ করে অনুষ্ঠানে মোশাররফ করিম বলেন, ‘একটা মেয়ে তার পছন্দমতো পোশাক পরবে না? আচ্ছা পোশাক পরলেই যদি প্রবলেম হয়, তাহলে সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব, যে বোরকা পরেছিলেন তার ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব? কোনো যুক্তি আছে?’

অনুষ্ঠানে তিনি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সবাইকে শপথবাক্য পাঠ করান। ব্যস এটুকুতেই ক্ষেপে গেছে বাংলাদেশের অনুভূতিপ্রবণ একটি গোষ্ঠি, যারা বাংলাদেশকে পিছিয়ে নিতে চায়। তারা মোশাররফ করিমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তুলছে। তার বাড়িতে হামলা হয়েছে। তাকে নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।

কিন্তু অনেকবার মোশাররফ করিমের বক্তব্য শুনেছি। কোন কথায়, কিভাবে, কাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগলো বুঝতে পারছি না। একজন নারী তার পছন্দমত পোশাক পরবেন, এটা বলাতে অন্যায় কোথায়? সারবিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে, নারীরা যখন পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে; তখন বাংলাদেশে নারীদের পোশাকের অবগুণ্ঠনে আটকে রাখতে চায় কারা? যারা চায় তারা অবশ্যই নারীদের ভালো চায় না, তারা চায় না বাংলাদেশ এগিয়ে যাক।

Advertisement

কয়েকদিন আগে সৌদি আরবের ‘কাউন্সিল অব সিনিয়র স্কলারস’ বা সবচেয়ে সিনিয়র ধর্মীয় চিন্তাবিদদের কাউন্সিলের সদস্য শেখ আবদুল্লাহ আল মুতলাক বলেছেন, সৌদি নারীদের এখন আর আবায়া বা বোরকা পরা বাধ্যতামূলক নয়। সৌদি আরবে যদি বোরকা পরা বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে বাংলাদেশের একজন অভিনেতা নারীদের পছন্দমত পোশাক পরতে বলাটা অপরাধ হবে কেন? কেন তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হবে? কেন তার বাড়িতে হামলা হবে? কেন তাকে নাস্তিক বলা হবে?

সৌদি আরবের ধর্মীয় চিন্তাবিদ নারীদের বোরকা পরার বাধ্যবাধকতা তুলে নিলেও নারীদের আব্রু বজায় রেখে পোশাক পরতে বলেছেন। শুধু সৌদি আরব নয়, সব দেশের নারীদের, শুধু নারীদের কেন, সব মানুষেরই আব্রু ও শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরা উচিত। পোশাক সভ্যতার জন্য। বন্য পশু পোশাক পরে না, মানুষ পরে, কারণ মানুষ সভ্য। তবে পোশাক মানুষের সাচ্ছন্দ্যের জন্য। এটা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বদলে যায়।

শীতকালে আপনি যেমন হাফপ্যান্ট পরে ঘুরবেন না, গরমেও নিশ্চয়ই আপনি ওভারকোট পরে হাঁটবেন না। বিকিনি পরে যেমন অফিস করবেন না, তেমনি শাড়ি পরে নিশ্চয়ই সমুদ্র স্নানে যাবেন না। আমি সবসময় বলি পোশাক মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ। সবারই নিজ নিজ পছন্দের শালীন পোশাক পরার অধিকার আছে। কেউ যদি বোরকা পরেন আমার আপত্তি নেই। কেউ যদি বোরকা না পরেন তাতেও আমার আপত্তি নেই। কেউ যদি শালীনতা না মানেন; স্থান-কাল ভুলে যান; সেটা তার সমস্যা। তাকে সবাই পাগল বলবে।

নারীর পোশাক নিয়ে এত কথা হচ্ছে, কারণ ইদানীং ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করা যেন ফ্যাশন হয়ে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ধর্ষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মোশাররফ করিম তো ৭ বছরের মেয়ের ধর্ষিতা হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তার অনুষ্ঠানের পরও দেড় বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পুরুষের মত দেখতে কেউ কেউ ধর্ষণ করে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে ধর্ষণের জন্য নারীদের দায়ী করা হচ্ছে। নারীরা কেন অমন পোশাক পরলো, নারী কেন হেসে কথা বললো, নারী কেন চোখে চোখ রাখলো, নারী কেন জন্মদিনের পার্টিতে গেল, নারী কেন সুন্দরী হলো- সব দোষ নারীর।

বাংলাদেশে ধর্ষণের পর নারী সমাজে অচ্ছ্যুৎ হয়ে যায়, একঘরে হয়ে যায়, কেউ কেউ অপমানে আত্মহত্যা করে। আর ধর্ষক বুক ফুলিয়ে চলে। ধর্ষণের বিচার চাওয়ার অপরাধে বিউটিদের দ্বিতীয় দফায় ধর্ষিত হতে হয়, প্রাণ দিতে হয়। যে দুয়েকজন সাহসী বিচার চাইতে থানা-পুলিশ-আদালত পর্যন্ত যান, তাদের অভিজ্ঞতা হয় আরো তিক্ত। থানায়, আদালতে বারবার ধর্ষণের বিবরণ দিতে দিতে বারবার অপমানিত হতে হয়। বাংলাদেশে ধর্ষণের সবচেয়ে ‘ন্যায্য’ বিচার হলো ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে। কী ভয়াবহ অন্যায়। একটা মেয়েকে জেনেশুনে সারাজীবন একজন ধর্ষকের সাথে সংসার করতে বাধ্য করা হয়।

দেশজুড়ে যখন ধর্ষণের প্রাদুর্ভাব। তখন অবশ্যই এর বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। ধর্ষককে ঘৃণা করতে হবে, ধর্ষিতাকে নয়। এগিয়ে আসতে হবে জনপ্রিয় তারকাদেরও। মোশাররফ করিমকে ধন্যবাদ। তিনি এই দায়িত্বটি সবচেয়ে ভালোভাবে পালন করেছেন। তিনি সত্য কথাটি সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু একটি অপশক্তি ধর্মের মোশাররফ করিমের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। এরা ধর্মের পক্ষের লোক নয়, এরা ধর্ষকদের পক্ষের।

মোশাররফ করিম সত্য কথা বললেও এই ধর্মান্ধদের চাপের কারণে নিজের অবস্থানে থাকতে পারেননি। নিজের ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, ‘চ্যানেল টুয়েন্টি ফোরে আমার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের একটি অংশে আমার কথায় অনেকে আহত হয়েছেন। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আমি যা বলতে চেয়েছি, তা হয়তো পরিষ্কার হয়নি। আমি পোশাকের শালীনতায় বিশ্বাসী এবং তার প্রয়োজন আছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা আমার অভিপ্রায় না। এ ভুল অনিচ্ছাকৃত। আমি দুঃখিত। দয়া করে সবাই ক্ষমা করবেন।’

ভুল না করেও মোশাররফ করিম ক্ষমা চেয়েছেন। ক্ষমা চেয়ে আবার উল্টো বিপদে পড়েছেন। সত্য কথা বলেও ক্ষমা চাওয়ায় একটি মহল আবার মোশাররফ করিমের ওপর ক্ষেপেছেন। পছন্দমত পোশাক পরার কথা বলে মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্ষুশুল হয়েছেন। আর দুঃখপ্রকাশ করে প্রগতিশীলদের উষ্মার মুখে পড়েছেন।

মোশাররফ করিম অনুষ্ঠানে যা বলেছেন, আমি তার সাথে পুরোপুরি একমত। আমি মনে করি শুধু মোশাররফ করিম নন, সব শিল্পীদেরই নিজেদের জনপ্রিয়তা কাজে লাাগিয়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে। সব শিল্পীকেই তার সামজিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রাখতে হবে।

তবে মোশাররফ করিমের অবস্থাটা আমি বুঝি। কেন তিনি সত্য কথা বলেও দুঃখপ্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন, তা বুঝতে আমাদের কষ্ট হয় না। আমাদের সমাজটাই এখন এমন ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে। সত্য কথা বলাটাও এখানে অপরাধ। মোশাররফ করিম একজন অভিনেতা; রাজনৈতিক কর্মী নন, অ্যাক্টিভিস্ট নন। তিনি সাহস করে সত্য কথাটা বলেছেন। আমাদের সবার উচিত ছিল তার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু মৌলবাদীরা যখন তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন, আমরা কিন্তু তাকে সাহস জোগাইনি। যখন তিনি বাধ্য হয়ে দুঃখপ্রকাশ করলেন, তখন সবাই তার গোষ্ঠি উদ্ধার করতে নেমে গেছি।

মোশাররফ করিম তার বক্তব্যে অটল থাকতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু দুঃখপ্রকাশ করার পরও আমি তার পাশেই আছি। কী বেদনায় তিনি নিজের নৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছেন, তা যেন আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করি। একা একজন শিল্পীর পক্ষে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। যদি আমরা সবাই তার পাশে থাকি, তাহলে শুধু তিনি নন, শিল্পীদের আরো অনেকেই ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন।

আলোচনায় যখন ধর্ষণ এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ার, আলোচনা যখন শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে; তখন আরটিভির এক অনুষ্ঠানে চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা ধর্ষণের মত একটি সিরিয়াস অপরাধ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করেছেন। অনুষ্ঠানে পূর্ণিমা চলচ্চিত্রের ভিলেন মিশা সওদাগরকে প্রশ্ন করেন, তিনি চলচ্চিত্রে কয়টি ধর্ষণ করেছেন, কাকে কাকে ধর্ষণ করেছেন, কাকে ধর্ষণ করে আনন্দ পেয়েছেন, কেন পেয়েছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। মিশা সওদাগরের উত্তর শুনে পূর্ণিমা যেভাবে হাসছিলেন, তা দেখতে খুব অশালীন লাগছিল। পূর্ণিমার মত একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী যখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন, তখন তিনি ধর্ষণকে একটি হাসি-ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত করেছেন। মোশাররফ করিম সত্য কথা বলেও দুঃখপ্রকাশ করেছেন, আর পূর্ণিমা অশালীন প্রশ্ন ও অশ্লীল ভঙ্গি করেও চুপ করে আছেন। আমরা দাবি করছি, পূর্ণিমা যেন তার বক্তব্য প্রত্যাহার করেন ও ক্ষমা চান। কারণ পূর্ণিমার বক্তব্য তার ভক্তদের কাছে ধর্ষণ নিয়ে ভুল বার্তা দেবে। পূর্ণিমা নয়, আমরা মোশাররফ করিমের পাশে আছি।

শিল্পীর যেমন সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। মোশাররফ করিমের সত্য বক্তব্য প্রচার করে চ্যানেল২৪ সেই দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, আরটিভি ঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। প্রচারের আগে পূর্ণিমার বক্তব্যটি সম্পাদনা করা উচিত ছিল।

আমাদের সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়তে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে ধর্ষকদের। নিশ্চিত করতে হবে তাদের সর্বোচ্চ সাজা।

১ এপ্রিল, ২০১৮

এইচআর/জেআইএম